হিন্দু ধর্মে মাস ও সময়: করণীয় ও নিষিদ্ধ বিষয় জানুন!

সরস্বতী পূজা পূজা পদ্ধতি জানুন!হিন্দু ধর্মে মাস ও সময় অনুযায়ী করণীয় ও নিষিদ্ধ বিষয়। হিন্দু ধর্ম এক বিশাল সমুদ্রের মতো, যেখানে প্রতিটি মাসের, প্রতিটি দিনের নিজস্ব মাহাত্ম্য আছে। কোন মাসে কী করতে হয়, আর কী করা উচিত না – এই নিয়ে আমাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে।
হিন্দু ধর্মে মাস ও সময়: করণীয় ও নিষিদ্ধ বিষয় জানুন!
তাই, আজকের ব্লগ পোস্টে আমরা আলোচনা করব হিন্দু ধর্মে মাস ও সময় অনুযায়ী করণীয় ও নিষিদ্ধ বিষয়গুলো নিয়ে। চলুন, জেনে নেওয়া যাক!

সূচিপত্রঃ হিন্দু ধর্মে মাস ও সময়: করণীয় ও নিষিদ্ধ বিষয় জানুন!

হিন্দু ধর্মে মাসের গুরুত্ব

হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতিটি মাসের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই মাসগুলোর মধ্যে কিছু মাস খুব শুভ, আবার কিছু মাসে বিশেষ কিছু কাজ করা নিষিদ্ধ। তাই কোন মাসে কী করা উচিত, তা জানা থাকলে আপনি আপনার জীবনকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারবেন।

বৈশাখ মাস (এপ্রিল-মে): করণীয় ও নিষিদ্ধ

বৈশাখ মাস হলো নতুন শুরুর মাস। এই মাসে নতুন বছর শুরু হয় এবং এটি অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।

  • করণীয়: এই মাসে দান করা, বিশেষ করে জল দান করা খুব ভালো। গরমে মানুষের কষ্ট নিবারণের জন্য জলসত্র খুলুন, পথিকদের জল দিন। এছাড়া, এই মাসে বিষ্ণুর পূজা করাও খুব ফলদায়ক।
  • নিষিদ্ধ: এই মাসে বিয়ে করা শুভ বলে মনে করা হয়, তবে কোনো শুভ কাজ শুরু করার আগে পঞ্চাঙ্গ দেখে নেওয়া ভালো।

জ্যৈষ্ঠ মাস (মে-জুন): করণীয় ও নিষিদ্ধ

জ্যৈষ্ঠ মাস মানেই গরমকাল। এই মাসে সূর্যের তেজ খুব প্রখর থাকে।তাই চলুন জৈষ্ঠ্যমাসে হিন্দু ধর্মে করণীয় ও নিষিদ্ধ বিষয় গুলো জেনে নিই।

জৈষ্ঠমাসে করণীয়: জ্যৈষ্ঠ মাসে গরিবদের অন্নদান করা খুব পুণ্যের কাজ। এছাড়া, এই মাসে জলের অপচয় না করে বরং তা বাঁচানোর চেষ্টা করুন। শরীরকে ঠান্ডা রাখতে ডাবের জল পান করাও খুব ভালো।

জৈষ্ঠ্যমাসে নিষিদ্ধ: এই মাসে দুপুর বেলায় বিশ্রাম না করে কঠোর পরিশ্রম করা উচিত না। কারণ শরীর খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আষাঢ় মাস (জুন-জুলাই): করণীয় ও নিষিদ্ধ

আষাঢ় মাস বর্ষার আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। এই মাসে বৃষ্টির জন্য প্রকৃতি যেন হাঁ করে থাকে।নিম্নে আষাঢ় মাসে হিন্দু ধর্মে করণীয় ও নিষিদ্ধ বিষয় গুলো তুলে ধরা হলোঃ- 
  1. করণীয়: এই মাসে বৃষ্টির জন্য শিবের পূজা করা উচিত। এছাড়া, আষাঢ় মাসে গাছ লাগানো খুব শুভ।
  2. নিষিদ্ধ: এই মাসে জমি খনন করা বা মাটি কাটার কাজ করা উচিত না, কারণ এতে প্রকৃতির ক্ষতি হতে পারে।

শ্রাবণ মাস (জুলাই-আগস্ট): করণীয় ও নিষিদ্ধ

শ্রাবণ মাস মানেই শিবের মাস। এই মাসে শিবের ভক্তরা নানা উপাচারে তাঁর পূজা করেন। হিন্দু ধর্মে শ্রাবণ মাসে বেশ কিছু দিক নির্দেশনা রয়েছে। নিম্নবর্গের সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

করণীয়- শ্রাবণ মাসে প্রতিদিন শিবলিঙ্গে জল ঢালা খুব ভালো। সোমবারের ব্রত রাখা এই মাসের বিশেষত্ব। এছাড়া, রুদ্রাভিষেক করলে জীবনের অনেক বাধা দূর হয়।এছাড়াও, শ্রাবণ মাসে নিরামিষ খাবার গ্রহণ করা উচিত। আমিষ খাবার ও মদ্যপান থেকে দূরে থাকুন।

নিষিদ্ধ- শ্রাবণ মাসে পেঁয়াজ, রসুন ও বেগুন খাওয়া উচিত না। কারণ এগুলো শরীরকে গরম করে এবং এই মাসে শরীর ঠান্ডা রাখাই ভালো। এছাড়া, এই মাসে কোনো দরিদ্র মানুষকে অপমান করা উচিত না।

ভাদ্র মাস (আগস্ট-সেপ্টেম্বর): করণীয় ও নিষিদ্ধ

ভাদ্র মাস হলো উৎসবের মাস। এই মাসে জন্মাষ্টমী পালিত হয়।
  • করণীয়: ভাদ্র মাসে রাধা-কৃষ্ণের পূজা করা খুব শুভ। এছাড়া, এই মাসে ভাগবত কথা শ্রবণ করলে মন পবিত্র হয়।
  • নিষিদ্ধ: এই মাসে কোনো নতুন কাজ শুরু করা উচিত না। কারণ, এটি শুভ বলে গণ্য হয় না।

আশ্বিন মাস (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর): করণীয় ও নিষিদ্ধ

আশ্বিন মাস মানেই দুর্গাপূজা। এই মাসে চারিদিকে উৎসবের আমেজ থাকে।
  • করণীয়: এই মাসে দুর্গা মায়ের পূজা করা, অঞ্জলি দেওয়া এবং মায়ের মন্ত্র জপ করা খুব ভালো। এছাড়া, দরিদ্রদের বস্ত্র দান করলে মা দুর্গা খুব খুশি হন।
  • নিষিদ্ধ: নবপত্রিকা স্থাপন করার পর গাছ কাটা বা ছেঁড়া উচিত না। এতে মায়ের প্রতি অশ্রদ্ধা জানানো হয়।

কার্তিক মাস (অক্টোবর-নভেম্বর): করণীয় ও নিষিদ্ধ

কার্তিক মাস হলো আলোর মাস। এই মাসে দীপাবলি পালিত হয়।
  • করণীয়: কার্তিক মাসে লক্ষ্মী মায়ের পূজা করা উচিত। এছাড়া, এই মাসে প্রদীপ দান করলে সংসারে সুখ-শান্তি বজায় থাকে।
  • নিষিদ্ধ: এই মাসে মিথ্যা কথা বলা বা কারোর সাথে খারাপ ব্যবহার করা উচিত না। এতে লক্ষ্মী মা রুষ্ট হন।

অগ্রহায়ণ মাস (নভেম্বর-ডিসেম্বর): করণীয় ও নিষিদ্ধ

অগ্রহায়ণ মাস হলো বিবাহের মাস। এই মাসে অনেক শুভ কাজ হয়।
  • করণীয়: এই মাসে অন্ন দান করা খুব ভালো। এছাড়া, এই মাসে নারায়ণ পূজা করলে সংসারে সমৃদ্ধি আসে।
  • নিষিদ্ধ: এই মাসে কোনো শুভ কাজ করার আগে অবশ্যই পঞ্চাঙ্গ দেখে নেওয়া উচিত।

পৌষ মাস (ডিসেম্বর-জানুয়ারি): করণীয় ও নিষিদ্ধ

পৌষ মাস হলো শীতের মাস। এই মাসে শীতের প্রকোপ বাড়ে।এ মাসেও রয়েছে বেশকিছু করণীয় ও নিষিদ্ধ বিষয়।
  • করণীয়: পৌষ মাসে গরিবদের শীতবস্ত্র দান করা উচিত। এছাড়া, এই মাসে সূর্যদেবের পূজা করলে শরীর সুস্থ থাকে।
  • নিষিদ্ধ: এই মাসে বাসি খাবার খাওয়া উচিত না। সবসময় টাটকা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।

মাঘ মাস (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি): করণীয় ও নিষিদ্ধ

মাঘ মাস হলো পবিত্র স্নানের মাস। এই মাসে গঙ্গাস্নান করা খুব পুণ্যের কাজ।

  • করণীয়:  মাঘ মাসে গঙ্গাস্নান করুন এবং দান করুন। এছাড়া, এই মাসে তিল দান করলে অনেক পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
  • নিষিদ্ধ: এই মাসে আমিষ খাবার এবং মদ্যপান করা উচিত না।

ফাল্গুন মাস (ফেব্রুয়ারি-মার্চ): করণীয় ও নিষিদ্ধ

ফাল্গুন মাস হলো রঙের মাস। এই মাসে হোলি পালিত হয়।
  1. করণীয়: ফাল্গুন মাসে রাধা-কৃষ্ণের পূজা করুন এবং আবির খেলুন। এই মাসে গরিবদের খাদ্য দান করলে খুব ভালো ফল পাওয়া যায়।
  2. নিষিদ্ধ: এই মাসে গাছ কাটা বা প্রকৃতির ক্ষতি করা উচিত না।

চৈত্র মাস (মার্চ-এপ্রিল): করণীয় ও নিষিদ্ধ

চৈত্র মাস হলো শেষ মাস। এই মাসে চৈত্র সংক্রান্তি পালিত হয়।

  1. করণীয়: চৈত্র মাসে শিবের পূজা করা উচিত। এছাড়া, এই মাসে গরিবদের বস্ত্র দান করলে খুব ভালো হয়।
  2. নিষিদ্ধ: এই মাসে আমিষ খাবার গ্রহণ করা উচিত না।

দিনের বিভিন্ন সময়ে করণীয় ও নিষিদ্ধ বিষয়

দিনের বিভিন্ন সময়েরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কোন সময়ে কী করা উচিত, তা জেনে আপনার দৈনন্দিন জীবনকে আরও সুন্দর করতে পারেন।

  • ব্রাহ্মমুহূর্ত (সূর্যোদয়ের আগে): করণীয় ও নিষিদ্ধ
ব্রাহ্মমুহূর্ত হলো দিনের সবচেয়ে পবিত্র সময়। এই সময় ঘুম থেকে উঠে ঈশ্বরের ধ্যান করলে মন শান্ত থাকে।

  1. করণীয়: এই সময় ঘুম থেকে উঠে ঈশ্বরের নাম জপ করুন। যোগা ও প্রাণায়াম করলে শরীর ও মন সুস্থ থাকে।
  2. নিষিদ্ধ: এই সময় ঘুমানো উচিত না।
  • সকাল

সকাল হলো দিনের শুরু। এই সময় মন ও শরীর সতেজ থাকে। তাই করণীয়: সকালে স্নান করে পূজা করা উচিত। এছাড়া, এই সময় পড়ালেখা করলে মনে থাকে। আর, নিষিদ্ধ: সকালে ঝগড়া করা বা খারাপ কথা বলা উচিত না।

  • দুপুর

দুপুর হলো বিশ্রামের সময়। এই সময় খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়া উচিত।এছাড়াও, আপনার উচিত দুপুরে খাবার পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন।আর দুপুরে কঠোর পরিশ্রম করা উচিত না।

  • সন্ধ্যা

সন্ধ্যা হলো পূজার সময়। এই সময় ঈশ্বরের আরাধনা করা উচিত।এছাড়াও, করণীয়: সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে ঈশ্বরের পূজা করুন এবং এই সময় ভগবদ্গীতা বা রামায়ণ পাঠ করলে ভালো লাগে। আর নিষিদ্ধ: সন্ধ্যায় ঘুমানো বা খারাপ চিন্তা করা উচিত না।

  • রাত্রি

রাত্রি হলো ঘুমের সময়। এই সময় শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া উচিত।রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ুন এবং সকালে তাড়াতাড়ি উঠুন।আর, বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকা বা সিনেমা দেখা উচিত না।

অমাবস্যা ও পূর্ণিমার গুরুত্ব

হিন্দু ধর্মে   অমাবস্যা  ও   পূর্ণিমার   বিশেষ  মাহাত্ম্য রয়েছে। এই দিনগুলোতে কিছু বিশেষ নিয়ম পালন করা হয়।

অমাবস্যা-র গুরুত্ব

অমাবস্যা হলো অন্ধকার রাত্রি। এই দিনটিতে পিতৃপুরুষের তর্পণ করা হয়।
  • করণীয়: অমাবস্যাতে পিতৃপুরুষের নামে দান করুন এবং তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করুন।
  • নিষিদ্ধ: এই দিনে কোনো শুভ কাজ করা উচিত না।

পূর্ণিমা-র গুরুত্ব

পূর্ণিমা হলো চাঁদের আলোয় ভরা রাত্রি। এই দিনটিতে ঈশ্বরের পূজা করা হয়।
  • করণীয়: পূর্ণিমাতে লক্ষ্মী মায়ের পূজা করুন এবং চন্দ্রের আলোতে ধ্যান করুন।
  • নিষিদ্ধ: এই দিনে তামসিক খাবার গ্রহণ করা উচিত না।

পয়ণমাসের গুরুত্ব

পয়ণমাস হলো একটি বিশেষ সময়, যা পিতৃপুরুষের স্মরণে পালন করা হয়।
  • করণীয়: এই মাসে পিতৃপুরুষের নামে দান করুন এবং তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য গীতাপাঠ করুন।
  • নিষিদ্ধ: এই সময় কোনো শুভ কাজ করা উচিত না।

কিছু অতিরিক্ত টিপস

  • প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ঈশ্বরের নাম স্মরণ করুন।
  • নিয়মিতভাবে পূজা ও প্রার্থনা করুন।
  • গরিবদের সাহায্য করুন এবং দান করুন।
  • পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন এবং পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখুন।
  • সবসময় ইতিবাচক চিন্তা করুন এবং হাসি-খুশি থাকুন।

লেখকের শেষ মন্তব্য

আশা করি, এই ব্লগ পোস্টটি আপনাকে হিন্দু ধর্মে মাস ও সময় অনুযায়ী করণীয় ও নিষিদ্ধ বিষয়গুলো সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দিতে পেরেছে। এই নিয়মগুলো মেনে চললে আপনি আপূর্ণ করে তুলতে পারবেন।

যদি আপনার মনে কোনো প্রশ্ন থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় কমেন্ট সেকশনে জিজ্ঞাসা করুন। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন! ধন্যবাদ!

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

রিফাত আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url
Sazid Hassan Rifat
Sazid Hassan Rifat
আমি সরকারী শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেন মহাবিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। আমি নিয়মিত লাইফ স্টাইল, অনলাইন ইনকাম, টেকনোলজি ও ই সার্ভিস নিয়ে লেখালেখি করি।নিয়মিত নতুন বিষয় নিয়ে লিখে যাচ্ছি যেন সবাই কিছু না কিছু শিখতে পারে। আপনাদের সামনে সকল প্ররকারের সঠিক এবং নির্ভুল তথ্য তুলে ধরার মাধ্যমে সাহায্য সহযোগিতা করাই আমার মূল উদ্দেশ্য। ধন্যবাদ।।